বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট অতীতে এদেশের প্রাকৃতিক জলাশয়ে মৎস্যসম্পদের প্রাচুর্যের কারণে এ বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার বিষয় উপলব্ধি করা হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, রোগের প্রাদুর্ভাব, পরিবেশগত বিপর্যয় ইত্যাদি নানা কারণে প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের প্রাচুর্যতা আশংকাজনক হারে হ্রাস পায়। ফলে এর প্রতি দেশের মৎস্য ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের গভীর মনোযোগ আকৃষ্ট হয়। এর ফলশ্রুতিতে দেশী এবং বিদেশী বিশেষজ্ঞ, পরিকল্পনাবিদ ও সরকারী নীতি নির্ধারকদের নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা, পর্যালোচনা, অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের কাজ শুরু হয়। এমনি প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল- এ ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত এক জাতীয় কর্মশালায় সরকারের নিকট সুপারিশ রাখা হয় যে, দেশের মৎস্য চাষ ও আহরণ ব্যবস্থাপনাকে সুষ্ঠু ও সঠিক বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দানের লক্ষ্যে অবিলম্বে জাতীয় পর্যায়ে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা প্রয়োজন। পরবর্তিতে কৃষি মন»ণালয়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি ও বিশ্ব ব্যাংকের মৎস্য বিষয়ক জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সহাপনের জোর সুপারিশ করে। উক্ত সুপারিশের প্রেক্ষিতে যথাযথ গবেষণা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থপনা পদ্ধতি উদ্ভাবনের মাধ্যমে মৎস্যসম্পদের সর্বাধিক উৎপাদন ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার স্বার্থে বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৮৪ সালে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তিতে ১৯৯৬ সাল প্রণীত আইনের মাধ্যেম ইনস্টিটিউট ব্যবসহাপনা শক্তিশালী করে একে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট নামে অভিহিত করা হয়। ইনস্টিটিউটের কর্মদায়িত্ব মৎস্য উন্নয়ন বিষয়ক সকল প্রকার গবেশনা পরিচালনা ও জাতীয় পর্যায়ে সকল প্রতিষ্ঠানের গবেষণার সমন্বয় সাধন মৎস্য উৎপাদন, ব্যবসহাপনা, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন ব্যবস্থার অধিকতর কার্যক্ষম ও স্বল্পব্যয়ী পদ্ধতি উদ্ভাবন অধ্যাদেশ ও আইনের লক্ষ্য অর্জনে অন্যান্য কার্যাদি সম্পাদন মৎস্য ক্ষেত্রে উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়নে সরকারকে সহয়তা প্রদান।
ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপনা মৎস্য ও পশুসম্পদ মন»ণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। সাধারণ দিক-নির্দেশনাসহ ইনস্টিটিউটের পরিচালনা ও সার্বিক নীতিমালা প্রণয়নের দায়িত্ব ১৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি ""বোর্ড অব গভরর্ণেস'' এর ওপর ন্যাস্ত রয়েছে। "" বোর্ড অব গভরর্ণেস'' এর গঠন নিম্নরুপ : ইনস্টিটিউট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রতিষ্ঠিত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের রাজস্বখাতে জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। পরিবেশগত অবস্থানুযায়ী দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইনস্টিটিউটের ৫টি গবেষণা কেন্দ্র ও ৫টি উপকেন্দ্র রয়েছে। কেন্দ্রগুলো হলো : ময়মনসিংহে স্বাদুপানি কেন্দ্র, চাঁদপুরে নদী কেন্দ্র, খুলনার পাইকগাছায় লোনাপানি কেন্দ্র, কক্সবাজারে সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র, বাগেরহাটে নির্মাণাধীন চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্র
এবং উপকেন্দ্রগুলো হলো : রাঙ্গামাটি কাপ্তাই লেক উপকেন্দ্র, সান্তাহার প্লাবনভূমি উপকেন্দ্র, খেপুপাড়া নদী উপকেন্দ্র, যশোর স্বাদুপানি উপকেন্দ্র, ও সৈয়দপুর স্বাদুপানি উপকেন্দ্র ।
প্রধান কার্যালয় রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার উত্তরে ময়মনসিংহস্থ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ইনস্টিটিউটের প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। ১৯৮৪ সালে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশবলে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হলে সদর দপ্তর প্রথমে চাঁদপুরসহ নদী কেন্দ্রে ও পরবর্তিতে ১৯৮৬ সালে ময়মনসিংসহ স্বাদুপানি কেন্দ্রে সহানান্তরিত হয়। ইনস্টিটিউটের গবেষণা কেন্দ্রসমূহ স্বাদুপানি কেন্দ্র : বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে ইনস্টিটিউটের সদর দপ্তরের সাথে স্বাদুপানি কেন্দ্র অবস্থিত। প্রায় ৪০.৪৯ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট এ কেন্দ্রটি পূর্বে মৎস্য অধিদপ্তরের অধীনে ""একুয়াকালচার এক্সপেরিমেন্ট ষ্টেশন'' নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তিতে ১৯৮৪ সালে ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হলে এটি মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে হস্তান্তরিত হয়ে স্বাদুপানি কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করে। স্বাদুপানি কেন্দ্রে আধুনিক সুবিধা সংবলিত ০.০৪-০.৬২ হেক্টর আয়তনের ১১৮টি গবেষণা পুকুর রয়েছে। এছাড়াও এ কেন্দ্রে রযেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ কার্প হ্যাচারী যেখানে গড়ে বছরে ৩ শত মিলিয়ন মাছের পোনা কৃত্রিম উপায়ে উৎপাদন করা যায়। তাছাড়াও রয়েছে উন্নত গবেষণাগার, মিলনায়তন, প্রশিক্ষণ ডরমেটরী ইত্যাদি। মাছের উন্নত জাত উদ্ভাবন, উন্নততর মৎস্যচাষ পদ্ধতির উদ্ভাবন, মাছের কৌলিতাত্ত্বিক গবেষণা, মাছের উন্নত মানের খাদ্য উদ্ভাবন ও পুষ্টি নিরুপণ, মাছের রোগবালাই দমন, ফার্মিং সিষ্টেম রিসার্চ, মাছ চাষীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা জরিপ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করাই এ কেন্দ্রের মূল কর্মসূচী। নদী কেন্দ্র : চাঁদপুর জেলা শহরের পূর্ব প্রান্তে ইনস্টিটিউটের নদী কেন্দ্র অবস্থিত। ১৭.২ হেক্টর এলাকা নিয়ে গঠিত এই কেন্দ্রে ০.১২-০.৩৭ হেক্টর আয়তনের মোট ৩৬টি পুকুর, দেশে সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত চাইনীজ কার্প হ্যাচারী, ৩টি গবেষণাগার, ফিশ মিউজিয়াম, অতিথি ভবন ও আবাসিক ভবনাদি রয়েছে। আভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ের অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য প্রজাতিসমূহের সর্বোত্তম উৎপাদন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে এ কেন্দ্রে গবেষণা পরিচালিত হয়ে থাকে। নদী ও অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের মাছের প্রজনন, পোনা উৎপাদন, চাষ পদ্ধতি ও ব্যবসহাপনা পদ্ধতি উন্নয়নের লক্ষ্যে এ কেন্দ্র হতে গবেষণা পরিচালিত হয়ে আসছে। এছাড়াও উক্ত কেন্দ্রের অধীনে রাঙ্গামাটিস্থ নদী-উপকেন্দ্র থেকে কাপ্তাই লেকে মৎস্য চাষ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ের ওপর, সান্তাহারস্থ প্লাবনভূমি উপকেন্দ্র থেকে বন্যাপ্লাবিত এলাকা ও হাওড়-বাওড়ের মৎস্যসম্পদ উন্নয়নের বিষয়ে এবং খেপুপাড়াসহ উপকেন্দ্র হতে নদীর মৎস্যসম্পদের ওপর গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। লোনাপানি কেন্দ্র : খুলনা জেলা শহর থেকে ৬৪ কিলোমিটার দক্ষিণে পাইকগাছা উপজেলায় ২৮.৭৪ হেক্টর জায়গা নিয়ে ইনস্টিটিউটের লোনাপানি কেন্দ্র অবস্থিত। কৃত্রিম উপায়ে বাগদা ও গলদা চিংড়িসহ লোনাপানির মাছের পোনা উৎপাদন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিংড়ি ও মাছের চাষের উন্নততর কলাকৌশল উদ্ভাবন, চিংড়ি চাষীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা জরিপ, উপকৃলীয় পরিবেশ ও সম্পদ ব্যবসহাপনা, বাগদা চিংড়ির প্রাকৃতিক উৎস নিরুপণ এবং পোনা সংগ্রহকালে পরিবেশের উপর এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি বিষয়ের উপর গবেষণা পরিচালনা করার লক্ষ্যে এ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র : প্রায় ৪ হেক্টর এলাকা নিয়ে এ কেন্দ্রটি কক্সবাজার জেলা সদরে অবস্থিত। এখানে ৫টি গবেষণাগার, সিষ্টার্ণ কমপ্লেক্স, পন্ড কমপ্লেক্স ও আবাসিক ভবনাদি রয়েছে। সামুদ্রিক কেন্দ্র অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের মজুদ নিরূপণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ কলাকৌশলের উন্নয়ন, সামুদ্রিক মৎস্য/চিংড়ি ও মৎস্যজাত পণ্যের গূণগত মান নিয়ন»ণ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর গবেষণা করে আসছে। ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাকালে চট্রগ্রামে সামুদ্রিক মৎস্য প্রযুক্তি কেন্দ্র সহাপনের নির্ধারিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় কক্সবাজারসহ সামুদ্রিক মৎস্যচাষ কেন্দ্রের সাথে একিভূত করে কক্সবাজার কেন্দ্রটিকে সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র নামে অভিহিত করা হয়। ইনস্টিটিউটের কর্মসংযোগ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান/সংস্থার সাথে ঘনিষ্ট সহযোগিতা ও কর্মসংযোগের মাধ্যমে ইনষ্টিটিউটের গবেষণা, প্রশিক্ষণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও কর্মকান্ড পরিচালিত হয়ে থাকে। তাছাড়াও, নীতি নির্ধারণী সংস্থাসমূহ, সম্প্রসারণ বিভাগ, বেসরকারী সংস্থাসমূহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানীমুখী শিল্প কারখানায় কর্মরত সশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নিকট ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত প্রযুক্তিসমূহ হস্তান্তরের লক্ষ্যে ইনস্টিটিউট ঘনিষ্টভাবে কাজ করে চলেছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সাথে ইনস্টিটিউটের কর্ম যোগাযোগ নিন্মের প্রবাহ চিত্রে দেখানো হলো : |